চোরাবালি থেকে

মোঃ শফিকুল ইসলাম প্রিয়
0

চোরাবালি থেকে

রাতের শেষ প্রহর। সেহরির ঠিক আগে যখন আকাশটা কালচে বেগুনি রঙের মখমলের মতো নুয়ে আসে মাটির কাছাকাছি, তখন আমার মনে হয়—পাপের এক বিশাল হিমালয় আমার আর তোমার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। আমি সেই পাথরের দেয়াল ঠেলে তোমার আরশের দিকে এগোতে পারি না। প্রতিটি গুনাহ যেন এক একটা ভারী শৃঙ্খল, যা আমার রুহের ডানাগুলোকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে। মনে হয়, তোমাকে পাওয়া আর বুঝি হলো না।

কিন্তু ঠিক তখনই, নিঝুম রাতের স্তব্ধতা চিরে কোনো এক অদেখা কোকিল গেয়ে ওঠে। সেই সুরের মূর্ছনায় আমার মনে পড়ে—তুমি তো সেই সত্তা, যে তার অবাধ্য বান্দাকে এক মুহূর্তের জন্যও বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যেতে দাও না। তুমি দয়ার আধার। তোমার রহমত সাগরের ঢেউগুলো পাষাণ হৃদয়ে আছড়ে পড়ে বারবার মনে করিয়ে দেয়, "লা তাকনাতু মির রাহমাতিল্লাহ"—আমার রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না।

আয়নায় নিজের চেহারার দিকে তাকালে আজ আর নিজেকে চেনা যায় না। কত সহজে তোমাকে ভুলে নফসের গোলামিতে মজে ছিলাম। যৌবনের সেই উদ্ধত দিনগুলোতে মনে হতো, এই পৃথিবীটাই বুঝি শেষ গন্তব্য। মরীচিকার পেছনে ছুটে চলা এক তৃষ্ণার্থ মুসাফিরের মতো আমি সুখ খুঁজেছি ধুলিকণায়। অথচ সেই সুখ ছিল বিষাক্ত। আমি এখন এক অতল চোরাবালিতে আটকে গেছি। এই চোরাবালি আমার অহংকার, আমার অবাধ্যতা। যতবার নিজেকে মুক্ত করতে চাই, ততবার আরও গভীরে তলিয়ে যাই। হে গাফুরুর রাহিম, এই চোরাবালি থেকে আমায় টেনে তোলো না? তোমার কুদরতি হাতের এক পশলা ইশারা কি আমার এই ডুবন্ত অস্তিত্বকে বাঁচাতে পারে না?

আমি জানি, রহমান তুমি। তোমার করুণার চাদর এতটাই বিশাল যে তাতে মহাবিশ্বের সমস্ত কালিমা ঢাকা পড়ে যায়। তবুও আমার এই অবুঝ হৃদয় কেন বারবার নিরাশার বিষণ্ণ চাদরে নিজেকে মুড়িয়ে নেয়? শান্তির সেই নূরানী পথ ছেড়ে কেন আমি মিছেমিছি দুঃখের জঞ্জাল কুড়াতে গেলাম? যখন সিজদায় মাথা রাখি, তখন কপাল ঘামায় না, বরং লজ্জায় গলে পানি হতে চায়। আমার নফস আমাকে বারবার ফিসফিস করে বলে, "তোর তো ফেরার পথ নেই।" অথচ আমার কলব ধুকপুক করে গেয়ে ওঠে মাওলা আলীর সেই বীরত্বগাথা ধৈর্য আর ইমাম হোসাইনের সেই তপ্ত বালুচরে দেওয়া সিজদার গল্প। তাঁদের সেই প্রেম শিখিয়েছে, রক্তমাখা বুক নিয়েও কী করে তোমার প্রেমে হাসা যায়।

ফিরে তাকাই ফেলে আসা সময়ের ধূসর পান্ডুলিপির দিকে। বাতাসের ঝাপটায় যখন সেই পাতাগুলো ওড়ে, তাতে কোনো পুণ্য বা সওয়াবের সুবাস নেই। আমার জীবনের পালের হাওয়া থমকে গেছে। সলিহীনের সেই খুশবুমাখা হাওয়া আমার নাগালে নেই। দুনিয়ার এই দুই দিনের হিসাবে বসলে শুধু গরমিল আর শূন্যতা ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। জগত-সংসারের পাটিগণিতে আমি বড় কাঁচা। আমলনামার খাতাটা খুললে দেখি শুধু কাটাকাটি আর ভুলের ভিড়। হিসাব মেলাতে গিয়ে দেখি, আমি আসলে নিজের কাছেই হেরে গেছি।

মাঝে মাঝে মনে হয়, আমার এই চোখের পানি কি আদৌ তোমার আরশ পর্যন্ত পৌঁছায়? তখনি দেখি, এক ফোঁটা চোখের পানি জায়নামাজে পড়তেই তা যেন একটা নূরের দরিয়া হয়ে যাচ্ছে। সেই দরিয়ায় আমার নফসের সমস্ত কালিমা ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যাচ্ছে। আমি স্পষ্ট অনুভব করি, ফানা হয়ে যাওয়ার মধ্যেই আসলে বাকা বা চিরস্থায়ী জীবনের স্বাদ লুকিয়ে আছে। যখন আমি নিজেকে পুরোপুরি তোমার ইচ্ছার কাছে বিলীন করে দিই, তখনই আমার রুহ মুক্তি পায়।

হে আমার প্রিয়তম ইলাহ! জান্নাত পাওয়ার লোভে নয়, বরং তোমার দিদারের তৃষ্ণায় আমি এই তপ্ত মরুভূমিতে দাঁড়িয়ে আছি। মুক্তির পথ তো তোমার হাতেই। তুমি কি সেই বন্ধ কপাট খুলে দেবে না? আমার হৃদয়ের মরুদ্যানে কি একবার বিশ্বাসের ফুল ফুটবে না? নফসের এই অন্ধকার কারাগার ভেঙে আমি এখন তোমার ইশকের উন্মুক্ত আসমানে উড়তে চাই। যে আসমানে শুধু তোমার নামের জিকির আর নবীজীর (সা.) প্রতি দুরুদের গুঞ্জন প্রতিধ্বনিত হয়।

রাত শেষ হয়ে আসছে। মুয়াজ্জিনের আজানের সুর যখন নিথর আকাশকে বিদীর্ণ করে দিচ্ছে, তখন আমার মনে হচ্ছে—আমি আর একা নই। আমার সমস্ত পাপের পাহাড় ছাপিয়ে তোমার ক্ষমার মেঘেরা ঘনিয়ে আসছে। চোরাবালিটা এখন আর আমাকে টানছে না, বরং আমি অনুভব করছি এক অদৃশ্য নূরানী স্পর্শ যা আমাকে আলোর দিকে টেনে তুলছে। হিসাবের গরমিলগুলো আজ তোমার দয়ার অংকে মিলে গেছে।

শান্তি। এক অপার্থিব প্রশান্তি আমার রূহকে ঘিরে ধরছে। আমি এখন আর নিরাশার চাদরে ঢাকা নই, বরং আমি এখন তোমার ভালোবাসার নূরে অবগাহন করছি। হে আমার মাওলা, তোমার বান্দা ফিরে এসেছে। তুমি কি তাকে ফিরিয়ে দেবে?

”এই লেখাটির মেধাস্বত্ত সম্পুর্ণ লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত, লেখকের অনুমতি ছাড়া এই লেখার অংশ বিশেষ বা সম্পূর্ণাংশ অন্য কোন মিডিয়াতে প্রকাশ করা আইনত দন্ডনীয় অপরাধ হিসাবে গন্য হবে।”

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

আপনার মূল্যবান মতামত দিন। আমরা আপনার কমেন্টের অপেক্ষায় আছি! দয়া করে গঠনমূলক মন্তব্য করুন এবং কোনো স্প্যাম বা বিজ্ঞাপন লিংক শেয়ার করবেন না।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)
3/related/default